শামস শামীম::
সুনামগঞ্জ হাওর আন্দোলনের নেতা ও কৃষক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার (৭০)। বিভিন্ন ফোরামে হাওর নিয়ে সোচ্চার তিনি। চলতি মওসুমে হাওরের বোরো ফসল জলাবদ্ধতায় নষ্ট হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হাওরে এবার কাচইরা (কাচা বা বৃষ্টি বাদলের মওসুম) চলছে। ৫, ১০, ১৫, ২০, ৩০ এমনকি আরো বেশি সময় পর পর এমন সর্বনাশা কাচইরা বছর ফিরে আসে। তবে আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা প্রচারের সুযোগ না থাকায় মানুষ জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হওয়ার ঘটনা জানতে পারতোনা।
এবছর সেটা জানতে পারছে। কাচইরা বছরের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতিটি হাওরকে পুকুর বানিয়ে পানি নিষ্কাশনের পকেট বন্ধ করে দেওয়ায় জলাবদ্ধ হাওরের পানি নিষ্কাশিত হচ্ছেনা বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রতি বছর লাখ লাখ টন মাটির বাঁধ করায় হাওর ও হাওরের ভিতরে প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণের আধার জলাশয়, হাওরের সঙ্গে যুক্ত নদ নদী খাল ভরাট হয়ে গেছে। এসব কারণে এই সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে। এ নিয়ে কোনও সরকারই কোনও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিচ্ছেনা বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রকৌশলীদের অস্থায়ী পরিকল্পনা কেবল বাঁধকেন্দ্রিক। কোনও স্থায়ী পরিকল্পনা নেই প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর হাওরকে নিয়ে।
হাওরের প্রাণ ও প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করেন সজল কান্তি সরকার। তিনিও জানালেন কাচইরা বছরের কথা। তবে ফসলডুবির জন্য তিনি হাইব্রিড বা উচ্চ ফলনশীল ধান রোপনের কারণে মওসুম বিলম্বিত হয়ে ফসলহানি ঘটছে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, হাওর হলো প্রাকৃতিক বা আদিধান রোপণের ভূমি। হাওরে চাষ হবে বোরো, শাইল, লালডিঙাসহ দেশি প্রজাতির ধান। কিন্তু এখানে অধিক উৎপাদনের নামে হাইব্রিড ও উফশী ধান চাষাবাদ করার কারণেই মওসুম বিলম্বিত হচ্ছে। এই ধান প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারেনা। অথচ দেশি ধান চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহেই পেকে যায়। আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যদিও এই ধানে ফলন কম বলে জানান তিনি। তবে তিনিও জানালেন অতিরিক্ত বাঁধের কারণে হাওরের সকল পকেট বন্ধ থাকায় এবং বাঁধের মাটি হাওরে চলে যাওয়ায় জরুরি পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না।
হাওরের চরিত্র পর্যবেক্ষণকারী এই দুই কৃষি বিশেষজ্ঞের মতো কাচইরা বছরের প্রমাণ পাওয়া যায় সরকারি পরিসংখ্যানেই। ২০২৫ সালের ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ এপ্রিল পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ডে দেখা যায় ওই সময়ে জেলার প্রধান নদী সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ছিল ৩.৫৯ সেন্টিমিটার, ৩.৪৬, ৩.৩৭ ও ৩.২৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হয়।
এবছর ২৭ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি (সকাল ৯টার হিসেব) ৩.৫১, ৩.৮৬, ৪.৩৬ এবং ৪.৫৪ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। একইভাবে গত বছর এই সময়ে বৃষ্টিপাত ছিল একেবারে কম। যার ফলে গত বছরের ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৮৩ ভাগ ধান কাটা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ বছর ২৬ এপ্রিল থেকেই ভারী বর্ষণ হচ্ছে। ২৭ এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জের লাউড়েরগড় পয়েন্টে ১৩৩ মিলিমিটার, ছাতক পয়েন্টে ৭৬ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ১৩৭ মিলিমিটার এবং দিরাই পয়েন্টে ২০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত বছর ২৮ এপ্রিলের পরিসংখ্যানে মাত্র ২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। পরের দিন থেকে ওই বছর মাত্র ৬ ও ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি ১৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এভাবে নদ নদীর পানি বাড়ছে।
এদিকে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে ওই বছর ২৮ এপ্রিলই ৮৩ ভাগ ধান কাটা হয়েছিল। আর এ বছর ২৮ এপ্রিলের প্রতিবেদনে ধান কাটা হয়েছে মাত্র ৪৪.৫০ ভাগ। তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে এবারের ধান কাটার পরিসংখ্যান আরো কম বলে জানান কৃষকরা। কারণ হাওরের পুরো পাকা ফসলই ডুবে আছে কোমর ও বুক সমান পানিতে। সরকারি হিসেবে (৩০ এপ্রিল) এ পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৯ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে বাস্তবে অন্তত ৬০ হাজার হেক্টর জমির ধান জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানান কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বক্তব্য: জেলার জামালগঞ্জ ও দিরাই উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত পাগনার হাওর। এই হাওরটি কৃত্রিম বাঁধের কারণে প্রতি বছরই জলাবদ্ধতায় ধান রোপন করতে বিলম্ব হয়। এবারও বাঁধ কাটা নিয়ে গত ঈদুল ফিতরের আগের দিন মারামারি হয়েছে। এবার বৃষ্টির পর পুরো হাওর ডুবে একাকার হয়ে যায়। হাওরের নিম্নাঞ্চলের সব অর্ধেক ক্ষেত অনেক আগ থেকেই পানির নিচে চলে গেছে। এখন উপরের অংশ এমনকি মাড়াই ও শুকানোর জায়গাও পানিতে ডুবে গেছে। এই হাওরের গজারিয়া গ্রামের কিষাণী আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমরা লেনাদেনা কইরা লামার হাওরে গিরস্থি করছি। অহন হাচ লাখ টাকার ধান পানির তলে। সরকার আমরারে দেহন লাগবো।
তিনি জানান, তার নামার হাওরে ৬ কেয়ার ক্ষেত (১ কেয়ার ৩০ শতাংশ), আর উপরের আরো ৬ কেয়ার ক্ষেত রোপন করেছিলেন। মাত্র ২ কিয়ার ক্ষেতের ধান কেটেছেন। নামার হাওরের ক্ষেত এখন আর কাটার সুযোগ নাই।
একই হাওরের জলিলপুর গ্রামের কৃষক রথিন্দ্র বর্মণ হাওরের ডুবে যাওয়া ফসলের দিকে থাকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে বিষণ্ণ মনে ধানের ডুবে যাওয়া দেখছেন। ছলছল চোখে তিনি বলেন, ‘আমার অনেক টেকা লস অইগিছে। ৪৫০ মন ধান পাওয়ার কথা। ৫ লাখ টেকার লস পোষাইতে ৩-৪ বছর লাগবো। মনে করছিলাম ইবারের গিরস্তি দিয়া ঋণ তনি মুক্তি পাইমু। কিন্তু ইবার ঋণে আরো জড়াইছে আমারে, ভগবান আশা পূরণ করেনি। আমার খুব ক্ষতি হইয়া গেছে। তিন বাচ্চা ও পরিবার নিয়ে কিভাবে চলতাম।’
একই হাওরের গজারিয়া গ্রামের কৃষক পলাশ মিয়া বলেন, ‘১২ কিয়ার জমিনো ধান লাগাইছলাম। মাত্র ৫ কিয়ার কাটছি। নিচের ধান কাটা বাকি রইছে। আর কাটার উপায় নাই। যে ৫ কিয়ার লোক দিয়া কাটাইছি কাটাইতে ও আনতে ডাবল টেকা গেছে।’
দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশের কৃষক ইসলামপুর গ্রামের বশির মিয়া বলেন, ‘দশ কিয়ার ক্ষেতো ধান লাগাইছলাম। সব পাইন্যে নিছেগি। অনে কাচা বাল বাচ্চারে লইয়া সাতরাইয়া কাটরাম। তারপরও খোরাকি তোলতে পারতাম না।’ শুধু দেখার হাওর বা পাগনার হাওরই নয় জেলার ছোট বড়ো ১৩৭টি হাওরেরই একই দশা। এবার জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৪ লাখ মে.টন ধান উৎপাদিত হওয়ার কথা ছিল। গত ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি হিসেবে হাইব্রিড ২ লাখ ১১ হাজার ১০৩.৯০ মে.টন, উফশী ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৪ মে.টন এবং স্থানীয় ১ হাজার ৭৩৫.৩৬ মে.টন উৎপাদিত হয়েছে বলে সরকারি হিসেবে জানানো হয়েছে।
এদিকে কৃষকরা জানিয়েছেন জলাবদ্ধতায় হাওরের উপর ও নিচের ধানও তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কাটা ও মাড়াই করা ধানও পানির নিচে। এবার অর্ধেক ধানও গোলায় তোলা সম্ভব নয় বলে জানান ভুক্তভোগী কৃষকরা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায় বলেন, এবার বাঁধ না ভাঙলেও বাঁধের কুফলে হাওরে জলাবদ্ধতা প্রকট হয়েছে। কারণ প্রতি বছর অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে এবং বাঁধের মাটির কারণে হাওর, নদী জলাশয় ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়েছে। এ কারণে হাওরের ফসল এবার ডুবে নষ্ট হয়েছে। এ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের হিসেবে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু সরকারি হিসেবে বলা হয়েছে মাত্র ২০০ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। যা বাস্তবতার সঙ্গে কোনও মিল নেই।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. ইমদাদুল হক বলেন, বুধবার দিবাগত রাতে জেলায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পানিও সামান্য কমেছে। রোদও ছিল। তবে হাওরগুলোতে জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ৩-৪ দিনের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ধান কাটা বিলম্বিত হয়েছে। এসময় হাওরের ধান ডুবেছে। তবে বৃহস্পতিবার দিনে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষকরা ধান কাটা ও মাড়াই এবং শুকাতে পেরেছেন। জলাবদ্ধতায় এবার ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
অপরিকল্পিত বাঁধে হাওরে সর্বনাশ
- আপলোড সময় : ০১-০৫-২০২৬ ১২:৫৫:০৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০১-০৫-২০২৬ ১২:৫৯:৫৭ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ